রতিকান্ত পাল ওরফে ঝড়ু পাল

Spread the love

‘রতিকান্ত পাল ওরফে ঝড়ু পাল’ বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী একজন জাত শিল্পী। চিত্রশিল্পী, অভিনেতা ও সঙ্গীতশিল্পী `ঝড়ু পাল’  ১৮৯৯ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের বারোঘরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।  তাঁর পিতার নাম প্রাণহার পাল। রতিকান্ত পাল ওরফে ঝড়ু পাল জন্মের দিন প্রচন্ড ঝড় হয়েছিল বলে তাঁর নাম রাখা হয় ঝড়ু। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে, ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত। ছেলে বেলাতেই মা-বাবাকে হারান। বেড়ে ওঠেন বারোঘরিয়ায়। মামার বাড়িতে। প্রতিভা কখনো লুকায়িত থাকেনা। তাই ছবি আঁকার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক কোন বিদ্যা না থাকলেও তিনি জেলার সেরা আঁকিয়ে ছিলেন।

রতিকান্ত ঝড়ু পাল ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতঙ্গ শচীনদেব বর্মন ও বাংলাদেশের অন্যতম সেরা চিত্রশিল্পী কামরুল হাসানের সমসাময়িক। এই সমস্ত গুণী মানুষদের সাথে বেশ কিছু কাজ করার অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে। ঝড়ু পালের ছবি আঁকার হাতেখড়ি হয় নবাবগঞ্জ কাচারিতে, সার্কাস পার্টিও ছবি দেখে এসে বাড়িতে অনুশীলনের মাধ্যমে। অনুশীলন করেই পরিণত হয়েছিলেন জাত শিল্পীতে। ঝড়ুপাল বিয়ে করেছিলেন গোদাগাড়ীর বাসুদেবপুর গ্রামে। বিয়ের পরই বিভিন্ন থিয়েটারের জন্য চিত্রকল্প আঁকার কাজ শুরু করেন। তাঁর এক-একটি ছবি ছিল জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাই অল্প সময়ে সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর আঁকা শিল্পকর্ম নজরে পড়ে সেই সময়ের জমিদার বাবুদের। পশ্চিমবঙ্গেও বিভিন্ন জমিদার বাড়িতেও ঝড়ুপাল অভিনয় ও প্রতিমা তৈরির জন্য গিয়েছিলেন। তবে বেশিরভাগ সময় স্থায়ী শিল্পী হিসেবে কানসাট জমিদার বাড়িতেই কাটান। নেতাজী সুভাষ বসুও ঝড়ুপালের শিল্পকর্ম দেখে অভিভূত হয়েছিলেন। কেননা মাত্র ১২ মিনিটের মধ্যে কাদা দিয়ে নেতাজীর মূর্তি নির্মাণ করেছিলেন তিনি। তাঁর চিত্রকল্প এতটাই শিল্পবোধসম্পন্ন ছিল যে তা দেখে চলচ্চিত্র শিল্পী আনোয়ার হোসেন এবং আনোয়ারা অভিভূত ও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। নবাবগঞ্জ বিডি হলে তাঁর চিত্রকর্ম দেখে তাহের উদ্দিন ঠাকুর শিল্পী ঝড়ু পালকে সে সময় ৫০ হাজার টাকা উপহার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। যদিও সেপ্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি। ১৯৬৮ সালে শিল্পী কামরুল হাসান ঝড়ুপালের আঁকা ছবি দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। আর আশ্চর্য হয়েছিলেন তার ১০০ রকমের রঙের পেয়ালা দেখে। অভিনয় ও সঙ্গীতেও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। অভিনয়কেও সিরিয়াসলি নিয়েছিলেন বলেই একসময় পোস্ট অফিসের পিওন পদেও চাকরিটি ছেড়ে দেন। মহিলা শিল্পী হিসেবেই বেশিরভাগ অভিনয় করেছেন তিনি। নবাব সিরাজ  উদ্দৌলা আলেয়া এবং পথের শেষে’ শুখেদার চরিত্রে অভিনয় কওর ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিলেন। অভিনয় করে অনেক রৌপ্য পদক অর্জন করেছিলেন তিনি। কলকাতার মিনার্ভাস্টার থিয়েটার স্টেজেও অভিনয় করে যথেষ্ট প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। ঝড়ুপাল গায়ক হিসেবে ও যথেষ্ট সম্মান অর্জন করেছিলেন। গানের জন্য তৎকালীন বিখ্যাত শিল্পী শচীনদেব বর্মনের তত্তাবধানে কলকাতা রেডিও সেন্টারে উপ অডিশন দিয়েছিলেন নজরুল গীতির জন্য। সুযোগও হয়েছিল তাঁর। কিন্তু বাদ্যযন্ত্রেও সঙ্গে তালিম নেবার জন্য কলকাতায় ১৭ দিন অবস্থান করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। শিল্পী ঝড়ুপাল চলে আসেন গ্রামের বাড়িতে। সেই সময় তার গানের সাথী ছিলেন বিখ্যাত গায়ক কমলা বড়ুয়া ও জগন্ময় মিত্র।

সাত সন্তানের জনক রতিকান্তপাল ওরফে ঝড়ুপাল  ১৯৭৭ সালে ৮৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। বহু গুণে গুণান্বিত প্রথিতযশা শিল্পী ঝড়ু পাল ২০০৩ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার শতবর্ষ পূর্তি উৎসবে ‘গুণীজন’ হিসেবে সম্মাননা পেয়েছেন। {অসমাপ্ত/বিস্তারিত প্রকাশিতব্য গ্রন্থ- ‘আলোকিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ’ www.alokito-chapainawabganj.com (চাঁপাইনবাবগঞ্জের দু’শো বছর ইতিহাসের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সংক্ষিপ্ত জীবনী ১ম ও ২য় খণ্ড) লেখক- মাহবুবুল ইসলাম ইমন}