মমতাজ উদ্দীন আহমদ

বাংলাদেশের প্রথিতযশা নাট্যকার, কথাশিল্পী, ভাষাসৈনিক প্রফেসর মমতাজ উদ্দীন আহমদ ১৯৩৫ সনে ১৮ জানুয়ারী তৎকালীন মালদাহ জেলা (চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ভারতের কিছু অংশ) অর্থাৎ চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার উত্তর কোনে হাবিবপুর থানার আইহো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কলিমুদ্দিন আহমদ। ১৯৪৭ এর দেশ-বিভাগের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার কানারহাট গ্রামে তাঁরা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। প্রফেসর মমতাজ উদ্দীন মালদাহ জেলা স্কুল, ভোলাহাট রামেশ্বর পাইলট ইনস্টিটিউশন এবং রাজশাহী সরকারি কলেজে লেখাপড়া করেন। তৎকালীন রাজশাহীর তুখোর ছাত্রনেতা ও ভাষাসৈনিক গোলাম আরিফ টিপুর (বাংলাদেশের প্রথিতযশা আইনজীবী) সান্নিধ্যে ছাত্র রাজনীতিতে ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারীর দিবাগত রাতেই রাজশাহী সরকারি কলেজের মুসলিম হোস্টেলের গেটে ইট ও কাদা দিয়ে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছিল। অনেকেই এটিকে দেশের প্রথম শহীদ মিনার বলে দাবি করে থাকেন। এ শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগের সাথে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এ্যাড.গোলাম আরিফ টিপু, প্রফেসর মমতাজ উদ্দিন, ডা.মেসবাহুল হক বাচ্চু, প্রকৌশলী মজিবুর রহমান প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারী পূর্বাহ্ণেই অবশ্য পুলিশ এ শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলে। মাতৃভাষা আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রামে সংযুক্ত হওয়া এবং রাজনীতি করার কারণে তিনি ১৯৫৪, ৫৫, ৫৬ এবং ১৯৫৮ সালে গ্রেফতার হন।
তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালযের নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগের খ-কালীন অধ্যাপক ছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের নাট্যকলা ও সংগীতে বিভাগের খন্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন কমিটিতে একজন উচ্চতর বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, ঢাকার গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক ছিলেন। ভারতের দিল্লী, জয়পুর এবং কলকাতা শহরে তিনি নাট্যদলের নেতা হিসেবে ভ্রমন ও নাট্য মঞ্চায়ন করেন। তাঁর লেখা নাটক“কী চাহ শঙ্খচীল” এবং “রাজার অনুস্বারের পালা” কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকাভুক্ত।
চিত্রনাট্য রচনাসহ রেডিও, টেলিভিশন, মঞ্চ এবং চলচ্চিত্রের বিশিষ্ট চরিত্রে অভিনয় করেন একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত নাট্যকার মমতাজ উদ্দিন আহমদ। তাঁর রচিত নাট্য সমূহের মধ্যে ১.নাট্যত্রয়ী ২.হৃদয়ঘটিত ব্যাপার স্যাপার ৩.স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা ৪. কি চাহ শঙ্খচীল ৫.জমীদার দর্পণ ৬.সাত ঘাটের কানাকড়িসহ আরও অসংখ্য নাটক। ১.লাল সবুজের পালা ২.জোহরা ৩.কাঠগড়া (রবীন্দ্রনাথের শাস্তি গল্প অবলম্বনে) ৪.বিরাজ বউ প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য চিত্রনাট্য রচনা। বাংলাদেশের নাটকের ইতিবৃত্ত, বাংলাদেশের থিয়েটারের ইতিবৃত্ত, নীলদর্পন(সম্পাদনা), সিরাজউদ্দোলা (সম্পাদনা), নাটক বিষয়ে বিবিধ প্রবন্ধ প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য নাট্য বিষয়ক আলোচনা-রচনা। তাঁর লিখিত গদ্যরচনার মধ্যে ১.চার্লি চ্যাপলিন-ভাড় নয় ভব ঘুরে নয় (গবেষণা) ২. বাংলাদেশ প্রসঙ্গ বঙ্গবন্ধু (গবেষণা) ৩.আমার ভেতরের আমি (গবেষণা) ৪.আমার সময় এবং আমি(গবেষণা) উল্লেখযোগ্য। এছাড়া, তিনি জাতীয় পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন বিষয়ে কলাম লিখেন এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রচার স্পট ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।
দেশ ও জাতির সম্পদ, গুণি বুদ্ধিজীবী জীবন্ত কিংবদন্তী- মমতাজ উদ্দীন আহমদ ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। বাংলাদেশের শিল্প ও সাহিত্য অনন্য ভূমিকা রাখার জন্য তিনি পেয়েছেন জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের বহু পুরস্কার-সম্মাননা। এর মধ্যে ১.বাংলা একাডেমী পুরস্কার ২. শিশু একাডেমি পুরস্কার ৩. মাহববুবউল্লাহ জেবুন্নেসা ট্রাস্ট স্বর্ণপদক ৪.আলাউল সাহিত্য পুরস্কার ৫. বাচসাস চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও চিত্রনাট্য পুরস্কার ৬.সিকোয়েন্স অভিনয় ও নাট্য রচনা পুরস্কার ৭.বঙ্গবন্ধু সাহিত্য পুরস্কার ৮.নাটকে একুশে পদক (১৯৯৭) উল্লেখযোগ্য। { অসমাপ্ত… / বিস্তারিত প্রকাশিতব্য মূল গ্রন্থ- ‘আলোকিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ’ (চাঁপাইনবাবগঞ্জের দু’শো বছর ইতিহাসের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সংক্ষপ্তি জীবনী)